আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত একতরফা ও ডামি নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ নিয়ে সুন্নি জোটভুক্ত দলগুলোর বিতর্ক এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের বিতর্কিত সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি এবং চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-বায়েজিদ) আসনের বৃহত্তর সুন্নি জোট প্রার্থী তরুণ আলেম হাসান আজহারীর একটি ঘনিষ্ঠ আলাপের ভিডিও।
এদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে শেয়ার করে নুরুল আজিম রনি লেখেন, টাকার খেলা হবে পিও মিজানুর রহমান আহাজারি ব্রো।
এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন হাসান আজহারী। প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতা থেকে তিনি কতটা মুক্ত?
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির সঙ্গে আল্লামা হাসান আজহারীর বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ্য কথোপকথন। ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তার মনোনয়ন এবং অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
বৃহত্তর সুন্নি জোটের ব্যানারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণার পর থেকেই জোটটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভাইরাল ভিডিও সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
ডামি নির্বাচনে দায় এড়ানোর কৌশল?
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত তিনটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) নিয়ে গঠিত বৃহত্তর সুন্নি জোট অতীতে আওয়ামী লীগের ডামি নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিযোগ রয়েছে, জোটের একটি অংশ বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে অংশগ্রহণ সেই অভিযোগকে আরও শক্ত ভিত্তি দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম-৮ আসনে হাসান আজহারীর মনোনয়ন এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় সুন্নি জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনবিমুখতা নিয়ে প্রশ্ন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটভুক্ত তিন দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পর্যায়ের ছয়জন শীর্ষ নেতার মধ্যে পাঁচজনই প্রার্থী হননি। এর মধ্যে রয়েছেন দুইজন চেয়ারম্যান ও তিনজন মহাসচিব। চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার সভাপতিরাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না।
ব্যতিক্রম হিসেবে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর) আসন থেকে এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তথ্য ঘাটতির কারণে সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারীর মনোনয়ন প্রথমে স্থগিত হলেও পরে তা বৈধ ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন, মহাসচিব স.উ.ম আবদুস সামাদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জয়নুল আবেদিন জুবাইর এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না- যদিও তারা প্রত্যেকেই অতীতে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন।
নির্বাচনে না থাকার ব্যাখ্যায় এম এ মতিন ও জয়নুল আবেদিন জুবাইর বয়সজনিত কারণ দেখিয়ে তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনার কথা বলেছেন। স.উ.ম আবদুস সামাদ জানিয়েছেন, তাকে জোটের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ব্যাখ্যার আড়ালে রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে জোটের শীর্ষ নেতারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত হন। জুলাই আন্দোলনের পর সেই ভূমিকা নিয়ে কর্মী ও তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এমনকি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও তাদের বয়কটের আলোচনা উঠে আসে।
এই বিতর্ক এড়াতেই এবারের নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ও তরুণ মুখ সামনে আনা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই চট্টগ্রাম-৮ আসনে হাসান আজহারীর মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে ভাইরাল ভিডিও তার ‘তরুণ মুখ’ ইমেজে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
যদিও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুথানে সুন্নি জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে একমাত্র হাসান আজহারীকেই চট্টগ্রামে ছাত্রদের পাশে থাকতে দেখা গিয়েছিল। জোটের অন্যান্য নেতা ও আলেমদের ভূমিকা সে সময় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
হাসান আজহারীর বক্তব্য
ডামি নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিও প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাসান আজহারী চট্টলা সংবাদের প্রতিবেদককে বলেন, “আমি এর আগে কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিনি। সাধারণ জনগণ ও যুবসমাজের চাওয়াতেই প্রথমবারের মতো নির্বাচনে এসেছি।”
ভাইরাল ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি একজন বক্তা। তাই আমার কাছে সবাই আসবে, আবার আমিও দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে সবার কাছে যাব, এটাই স্বাভাবিক।”
তিনি আরও জানান, “আমি নুরুল আজিম রনির অফিসে গিয়েছিলাম তাফসিরুল কোরআন মাহফিলের দাওয়াত দিতে, যে মাহফিল আমি প্রতিবছর আয়োজন করি।”
সব দল-মতের মানুষকে মাহফিলে দাওয়াত দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
তবে হাসান আজহারীর দাবি, যারা অতীতে আওয়ামী লীগের গুপ্ত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারাই এখন তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।