বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বলেছেন, সমাবর্তন একটি একাডেমিক ঐতিহ্য ও জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী দেশের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে—নেতৃত্বের পরবর্তী প্রজন্ম, পেশাজীবী ও উদ্ভাবকদেরও। এই সমাবর্তন গ্র্যাজুয়েট ও তাদের পরিবারের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি এটি নতুন ও বৃহত্তর দায়িত্বেরও সংকেত। যেখানে জ্ঞানকে প্রজ্ঞার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে এবং দক্ষতাকে নৈতিকতার আলোকে পরিচালিত হতে হবে।
শনিবার সকালে কুমিরাস্থ স্থায়ী ক্যাম্পাসে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর ৬ষ্ঠ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আইআইইউসি’র চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিব। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইআইইউসি’র ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ন ম শামসুল ইসলাম। মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইআইইউসি’র ট্রেজারার ও সমাবর্তনের কো-কনভেনার প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত এক দশকে উচ্চশিক্ষা একটি বহুমাত্রিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যা বিপুলসংখ্যক যুবককে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষমতা দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন এক কেন্দ্র, যেখানে জ্ঞানের সৃষ্টি ও প্রয়োগ হয়। তিনি আরও বলেন, একটি সমাবর্তন গ্র্যাজুয়েটদের ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা, নির্ঘুম রাত ও অবিচল অঙ্গীকারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার গৌরবময় উদযাপন।
তিনি বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে যোগ্য, সৎ ও নৈতিকতা-সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার মিশন ও ভিশনে আইআইইউসি এখনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জাতীয় অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি প্রগতিশীল, আলোকিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ব্যয় নির্বাহযোগ্য উচ্চমানের শিক্ষা যুবসমাজকে ক্ষমতায়িত করে, অসাম্য কমায় এবং জাতিকে শক্তিশালী করে।
সমাবর্তন বক্তা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিব বলেন, সমাবর্তন কেবল একটি ডিগ্রির স্বীকৃতি নয়, বরং এটি জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা স্মৃতির নয়, বরং তাদের প্রজ্ঞা, বিচারবুদ্ধি ও নৈতিক মূল্যবোধের। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও ডেটা মাইনিংসহ প্রযুক্তির জয়জয়কার, অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয়, বিভাজন ও সংঘাত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্ঞান যখন নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে কেবল দক্ষ পেশাজীবী নয়, বরং নৈতিক চিন্তাবিদ ও নীতিবান নেতৃত্ব প্রয়োজন। ইসলামের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসলামের প্রথম নির্দেশ ‘ইকরা’ (পড়ো) জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। কোরআনের আয়াতসমূহ মানুষকে মহাবিশ্ব, ইতিহাস ও নিজের সত্তা নিয়ে গবেষণা ও চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। ইসলামে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য সত্যের সন্ধান ও সৃষ্টিজগতের কল্যাণ, অহংকার বা আধিপত্য বিস্তার নয়।
তিনি মুসলিম ইতিহাসের স্বর্ণযুগ স্মরণ করে বলেন, একসময় মুসলিম বিজ্ঞানীরা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ইবনে আল-হাইথামকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত ছিল, তখন মুসলিম বিশ্ব বীজগণিত, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে নেতৃত্ব দিয়েছে। ইসলাম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং মুসলমানদের পতন হয়েছে মেধাভিত্তিক চিন্তা ও নৈতিক শাসন থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে।
তিনি বলেন, ইসলামি জীবনব্যবস্থায় পৃথিবী রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি আমানত। ‘খিলাফাহ’ ও ‘আমানাহ’-এর ধারণার মাধ্যমে মানুষকে পৃথিবীর উন্নয়ন ও অপচয় রোধের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির উদ্ভাবন কেন এবং কী উদ্দেশ্যে হচ্ছে—এই নৈতিক প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আইআইইউসি কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি করে না, বরং এমন মানুষ তৈরি করতে চায় যারা বিশ্ব সভ্যতায় অবদান রাখবে। গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ইসলামের মূলনীতির আলোকে ন্যায়বিচার, শ্রেষ্ঠত্ব, আমানতদারি ও দয়া বজায় রেখে কাজ করতে হবে। একজন নীতিবান প্রকৌশলী বা অর্থনীতিবিদ সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, গ্র্যাজুয়েটদের নিজেদের কেবল ডিগ্রিধারী নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ বিশ্বদর্শনের দূত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ইতিহাস মানুষকে ডিগ্রির জন্য নয়, বরং তারা কী পরিবর্তন এনেছে তার জন্য মনে রাখে। জ্ঞান যখন দয়ার সঙ্গে, প্রযুক্তি যখন মানবতার সঙ্গে এবং বিশ্বাস যখন প্রগতির সঙ্গে যুক্ত হয়—তখনই প্রকৃত সভ্যতার জন্ম হয়।
বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আ ন ম শামসুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চশিক্ষা প্রসারে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে, যার ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনার প্রবণতা অনেকাংশে কমেছে। আইআইইউসি এ ক্ষেত্রে প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। নৈতিক ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সৎ, যোগ্য ও চৌকস প্রজন্ম গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, আইআইইউসি শুধু চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
স্বাগত বক্তব্যে আইআইইউসি’র ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, সমাবর্তন কেবল ডিগ্রি প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জ্ঞান, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও নৈতিক দায়িত্ববোধের মহৎ উদযাপন। তিনি বলেন, এই সমাবর্তনের মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েটরা সমাজের মূলধারায় পদার্পণ করলো। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কেবল একাডেমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়—সৃজনশীলতা, সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। দেশের সেবা ও মানবতার কল্যাণে নিজেদের জ্ঞান কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।