,

চট্টগ্রামে ডিবি অফিসে আটকে রেখে নির্যাতন, টাকা আদায়ের অভিযোগ এসআই মহিউদ্দীন রাজুর বিরুদ্ধে

চট্টগ্রাম পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কার্যালয়ের ভেতরে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে রাতভর আটকে রেখে শ্লীলতাহানি, পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও গুমের হুমকি দিয়ে এক কোটি ১০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মহিউদ্দীন রাজু।

ভুক্তভোগী লুৎফুর নেছা এ ঘটনায় আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। মামলার নথি, অর্থ লেনদেনের স্ক্রিনশট এবং অডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছে তদন্ত সংস্থা।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, লুৎফুর নেছার স্বামী মো. কাদের ওরফে ফজলুল কাদের বাদশা সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। সেখানে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাঁর কাছ থেকে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। স্বামী বিদেশে অবস্থান করায় চাপ প্রয়োগ শুরু হয় তাঁর স্ত্রী লুৎফুর নেছার ওপর।

মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরের মুরাদপুর এলাকায় নিজ বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি লুৎফুর নেছাকে তুলে নিয়ে যান। তাঁদের মধ্যে ডিবির এসআই মহিউদ্দীন রাজু, বরখাস্তকৃত সাবেক ডিবি কর্মকর্তা দীপঙ্কর, ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান ওরফে নাহিদ এবং আরও দুজন সহযোগী ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা লিখিত নোটিশ ছাড়াই তাঁকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।

এরপর তাঁকে নগরের মনসুরাবাদে ডিবি উত্তর বিভাগের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেছেন লুৎফুর নেছা। তাঁর দাবি, রাতভর তাঁকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয়। একই সঙ্গে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধে বাধ্য করতে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এমনকি তাঁদের হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

লুৎফুর নেছা বলেন, “আমার কাছে অডিও রেকর্ড আছে, টাকা লেনদেনের স্ক্রিনশট আছে। ডিবি কার্যালয় থেকেই আমাকে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এখন আমি কোথায় বিচার চাইবো?”

মামলার নথি অনুযায়ী, একপর্যায়ে ভয়ে টাকা দিতে রাজি হলে ডিবি কার্যালয়ের কম্পিউটারে তিনটি জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অঙ্গীকারনামা প্রস্তুত করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ না করলে এসআই মহিউদ্দীন রাজু প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন এবং এ বিষয়ে লুৎফুর নেছার কোনো আপত্তি থাকবে না। ওই নথিতে জোরপূর্বক তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ডিবি কার্যালয় থেকে ফিরে পরিবারটি আতঙ্কে পড়ে যায়। স্বর্ণালংকার বিক্রি, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এক কোটি ১০ লাখ টাকা জোগাড় করা হয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে অভিযুক্তদের হাতে ওই অর্থ তুলে দেওয়া হয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত একটি স্ক্রিনশটেও অভিযুক্ত এসআই মহিউদ্দীন রাজুর কাছে অন্তত ছয় লাখ টাকা পরিশোধের তথ্য দেখা গেছে বলে জানা গেছে। তবে এক কোটি ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও বাকি অর্থ আদায়ের জন্য চাপ ও হুমকি অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই মহিউদ্দীন রাজু। তিনি বলেন, “মো. হাসান নামে একজন আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকার স্বর্ণ-সংক্রান্ত একটি কেমিক্যালের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। আমি দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করেছি। টাকা নেওয়া বা নির্যাতনের অভিযোগ সঠিক নয়।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে বেআইনিভাবে আটক রাখেন, অর্থ আদায় করেন কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং রাষ্ট্রের আইনের শাসনের জন্যও গুরুতর হুমকি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, “আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে তুলে আনার সুযোগ নেই। আদালতের নির্দেশে পিবিআই তদন্ত করছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”