বৃহস্পতিবার , ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিপর্যস্ত কর্ণফুলী নদীকে বাঁচাতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

কর্ণফুলী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি প্রধান নদী । সুজলা, শস্য -শ্যামলা এবং পাহাড় বেষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিভাগের যে খ্যাতি তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এই কর্ণফুলী নদীর । এই নদীর বিধৌত পলি বালি ও কাঁকর প্রবৃত্তির সমন্বয় গড়ে ওঠেছে চট্টগ্রামের অববাহিকা । চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় কর্ণফুলী নদীর প্রভাব অপরিসীম । শুধু তাই নয় এ নদী আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণবায়ু । এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক শহর ও সমুদ্র বন্দর সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প স্থাপনা । তাছাড়া এ নদীর পানিকে গতিরোধ করে কাজে লাগিয়ে কাপ্তাই উপজেলায় উৎপন্ন করা হচ্ছে জলবিদ্যুৎ । এদেশের মৎস্য সম্পদের একসময় অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই নদী। হাজার-হাজার মানুষ এই নদীকে ঘিরে সারাবছর বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে । এমনকি এই নদী আমাদের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বড় এক অংশজুড়ে রয়েছে । এমনকি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই নদীর সৌন্দর্য ও নাব্যতা দেখে মুগ্ধ হয়ে তার কর্ণফূলী কাব্য গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন এই নদী তীরে বসে । সর্বোপরি বলতে গেলে কর্ণফুলী বাংলাদেশের অর্থনীতি , মানুষের জীবনযাত্রায় এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এই নদীর গুরুত্ব অপরিসীম।

চট্টগ্রাম শহরের কোলঘেষা কর্ণফুলী নদী বর্তমানে মারাত্মক দূষণের শিকার । শহরের ময়লা-আবর্জনা, শিল্প কারখানার বর্জ্য, গৃহস্থতলির আবর্জনা ও হাজার হাজর টন পলিথিন ইত্যাদি প্রতিনিয়ত এই নদীকে বিষাক্ত বর্জ্যের বহমান আঁধারে পরিণত করে চলছে । প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার টন বর্জ্য পদার্থ পতিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে । পাশাপাশি রয়েছে শিল্প-কারখানা ও চিকিৎসালয়ের রাসায়নিক বর্জ্য । এছাড়াও অসংখ্য নৌযানের পোড়া তেলের প্রভাবে বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর দূষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে । তাছাড়া জনগণের সচেতনতার অভাবে কর্ণফূলী নদীর তলদেশে পলিথিনের স্তর পর্যন্ত পড়েছে। আর তার উপর রয়েছে নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে নদী ভরাট এর মতো জঘন্য কাজ । গত বছরে চট্টগ্রামের নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন নামের একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের জরিপে দেখা যায় , ২০১৪ সালে শাহ আমানত সেতুর নিচে কর্ণফুলী নদীর প্রবাহমান ছিল প্রায় ৮৬৭ মিটার । এখন তা সংকুচিত হয়ে ভাটার সময় প্রায় ৪১০ এবং জোয়ারের সময় প্রায় ৫১০ মিটারে এসে দাঁড়িয়েছে । এই জরিপে আরও বলা হয় ২০১৬ সালের দিকে এই নদীর তীর ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ সংখ্যক মাছ বাজার, বরফ ফ্যাক্টরি, অবৈধ বসতি স্থাপন ও ভেড়া মার্কেট । ফলশ্রুতিতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নদীর প্রবাহমান ব্যাপক হারে হ্রাস পায় । একইসাথে এই কর্ণফূলীর অসংখ্য শাখা নদী মৃত্যুকূপে ধাবিত হয়ে পড়ে । এছাড়াও বর্তমানে এই নদীর তীরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ দখলের মহোৎসব চলছে । নদীর তীব্র দূষণ ও দখলের কারণে সম্প্রতি অসংখ্য নদী ও মৎস্য গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ এই নদী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং অসংখ্য জলজ সম্পদ বিপন্ন হওয়ার পথে । প্রকৃতপক্ষে তীব্রতর দূষণের কারণে এই নদী নাব্যতা হারিয়েছে এবং অবৈধ দখলের কারণে বর্তমানে এই নদী চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ।

কর্ণফুলী নদী দেশের অর্থনীতির প্রাণবায়ু । কিন্তু এ নদী বর্তমানে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায়, দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যখাত, জলজ সম্পদ ও মৎস্যখাতসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষতির সম্মুখীন দেশবাসী । এমনকি ইতিমধ্যে নদী গবেষকরা বলেছেন এই নদীর দূষণের কারণে দেশের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকি সম্মুখীন । ফলে এই নদীকে বাঁচানোর লক্ষ্যে সরকার ও বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল । ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, স্বল্প মেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী অ্যাকশন রেখে সাজানো হয়েছে ১০ বছরের সেই মহাপরিকল্পনাটি । এতে ৪৫ টি মূল কার্যক্রম এবং ১৬৭ টি সহযোগী কার্যক্রম করা হয়েছিল । কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় সরকারের গৃহীত সেই মহাপরিকল্পনাটি আজও কর্ণফূলী নদীর সংরক্ষণে সুষ্ঠুভাবে ও ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়িত হয়নি । একইসাথে হাইকোর্টের বিশেষ নির্দেশনা থাকার সত্ত্বেও এই নদীর তীরে অবৈধ দখলদারত্বের আজও সম্পন্ন অবসান ঘটেনি।

কর্ণফুলী নদী বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রাম প্রাণ। তাই এই নদীর সুরক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণ একান্ত প্রয়োজন । কেননা নদী বিপর্যস্ত হলে বিপর্যস্ত হবে দেশের অর্থনৈতিক জলজ সম্পদ এবং স্বাস্থ্যখাত সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত সমূহ । আর এই নিষ্ঠুর প্রভাব পড়বে এদেশের মানুষের উপর । তাই এই নদীকে সুরক্ষা রাখতে সর্বপ্রথম ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে । পাশাপাশি সরকার এবং নদী কমিশনের গৃহীত মহাপরিকল্পনাগুলো জেলা প্রসাশন এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দলমত নির্বিশেষে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে । একইসাথে পরিবেশ অধিদপ্তরকেও এই নদীর সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসতে হবে । যাতে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের প্রাণ এবং দেশের অর্থনীতি প্রাণবায়ু , কর্ণফুলী নদীর দূষণ ও অবৈধ স্থাপনা রোধ হয় এবং নদীর নাব্যতা পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে ।