মাত্র ১৩ বছরের একটি শিশু। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। যার হাতে থাকার কথা ছিল বই, খাতা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ। সেই হাতেই আমরা দেখছি আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা, বয়সের তুলনায় অকালপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার প্রবণতা, বস্তুগত প্রদর্শন, অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগ এবং কখনো কখনো ভুল সঙ্গের ভয়ংকর প্রভাব।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের সঙ্গে অপ্রতিমের অসম বয়সী বন্ধুত্বের কথাও পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিয়েও তদন্ত চলছে।
প্রশ্ন কি শুধু, অপ্রতিমকে কারা হত্যা করল ??
না, বরং প্রশ্নটি আরও বড়। কোন সামাজিক বাস্তবতা এমন অপরাধী মানসিকতা তৈরি করছে, যেখানে একটি শিশুর জীবন একটি মোবাইল ফোনের মূল্যের চেয়েও তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে?
আজকের কিশোরদের একটি অংশ এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে উঠছে দামী স্মার্টফোন, বাইক, পোশাক, অনলাইন জনপ্রিয়তা কিংবা দৃশ্যমান ভোগবাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম তাদের সামনে প্রতিনিয়ত এমন এক জীবনধারা উপস্থাপন করছে, যেখানে দেখানো, ভোগ করা এবং প্রভাব বিস্তার করাই যেন সাফল্যের সংজ্ঞা।
কিন্তু আমরা কি তাদের যথেষ্ট শেখাচ্ছি কীভাবে ‘না’ বলতে হয়? কীভাবে ভুল বন্ধুত্ব চিনতে হয়? কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? কীভাবে সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করতে হয়? কীভাবে ডিজিটাল জগতে নিরাপদ থাকতে হয়? কীভাবে অর্থ, প্রযুক্তি ও স্বাধীনতাকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়?
রাষ্ট্রের শিক্ষা-দর্শন অবশ্যই মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধকে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে স্বীকার করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত লক্ষ্যেও ন্যায়বোধ, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও সুনাগরিকের গুণাবলি বিকাশের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু নীতিতে মূল্যবোধের কথা লেখা আর বাস্তব জীবনে সেই মূল্যবোধের অনুশীলন দুটি এক জিনিস নয়।
শিক্ষার্থীর হাতে শুধু পাঠ্যবই তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দিতে হবে। তাকে শেখাতে হবে empathy, self-control, conflict resolution, digital citizenship, peer pressure মোকাবিলা, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং সহিংসতা প্রত্যাখ্যানের বাস্তব কৌশল।
একজন সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া কিংবা সর্বাধুনিক ডিভাইস কিনে দেওয়া যথেষ্ট নয়। তার বন্ধু কারা, সে কোথায় যায়, অনলাইনে কী দেখে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করে, আচরণে কী পরিবর্তন আসছে। এসবও অভিভাবকত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর আচরণগত ও সামাজিক বিকাশের দিকেও নজর দিতে হবে।
কারণ একজন শিক্ষিত মানুষ আর একজন নৈতিক মানুষ, সবসময় একই ব্যক্তি নয়।
আমাদের স্কুল-কলেজ পর্যায়ে তাই প্রয়োজন একটি কার্যকর Character & Life Skills Education framework, যেখানে নৈতিকতা শুধু পরীক্ষার একটি অধ্যায় হবে না, বরং বাস্তব জীবনের অনুশীলনের অংশ হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে নিয়মিত
আচরণ ও নৈতিকতা বিষয়ক interactive session;
peer-pressure ও bullying মোকাবিলার প্রশিক্ষণ;
মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ কর্মসূচি;
digital safety ও responsible social-media use শিক্ষা।
কারণ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কেবল শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না; অপরাধী মানসিকতা তৈরি হওয়ার আগেই তাকে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে হয়।
আজ অপ্রতিম। আগামীকাল কার সন্তান?
আমরা যদি এখনো মনে করি “আমার সন্তান তো ভালোই আছে”, “ও শুধু বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরে”, “মোবাইল তো সবাই ব্যবহার করে”, “এসব বয়সের স্বাভাবিক ব্যাপার” তাহলে হয়তো আমরা বিপদটি বুঝতে পারছি না।
একটি প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলার আগে আমাদের বুঝতে হবে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; মানুষ তৈরি করা।
কারণ আমরা যদি সন্তানদের হাতে প্রযুক্তি দিই, কিন্তু বিবেক না দিই। স্বাধীনতা দিই, কিন্তু দায়িত্ববোধ না দিই; অর্থ দিই, কিন্তু মূল্যবোধ না দিই; প্রতিযোগিতা শেখাই, কিন্তু মানবিকতা না শেখাই, তাহলে একদিন সেই শূন্যতার মূল্য আমাদেরই দিতে হবে।
অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও প্রয়োজন, আর কোনো অপ্রতিম যেন আমাদের অবহেলা, অসচেতনতা ও সামাজিক উদাসীনতার শিকার না হয়।
এখনই সময় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র সব পক্ষের সম্মিলিতভাবে প্রশ্ন করার:
আমরা কি শুধু শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করছি, নাকি সত্যিই মানুষ তৈরি করছি?
অপ্রতিমের নিথর দেহ যেন সেই প্রশ্নের শেষ সতর্কবার্তা না হয়।